মায়ের ছবি শেয়ার করে রোষানলে চঞ্চল-ভাবনা, তারকাদের প্রতিবাদ

মায়ের ছবি শেয়ার করে রোষানলে চঞ্চল-ভাবনা, তারকাদের প্রতিবাদ

মে ১১, ২০২১ 0 By বিনোদন২৪.কম

মা দিবসে ফেসবুকে মায়ের সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশ করেন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। এরপরই ধর্মীয় রোষানলে পড়েছেন এই অভিনেতা। ছবিতে তার মায়ের কপালে হিন্দুরীতি অনুসারে সিঁদুর ছিল। ছবিটি শেয়ার করার পরই শুরু হয় বাজে মন্তব্য। শুধু তাই নয়, উগ্র ধর্মীয় মন্তব্যে আঘাত করেছেন এই অভিনেতাকে।

কমেন্ট থেকে বোঝা যায়, অনেকেই চঞ্চল চৌধুরীকে মুসলিম হিসেবে জানতেন। অনেকে আবার মৃত্যুর আগে মুসলমান হওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে এই অভিনেতাকে।
বিষয়টি চোখ এড়ায়নি চঞ্চল চৌধুরীর। তাদের এসব নেতিবাচক কথার উত্তর দিয়েছেন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে। ধর্ম নয়, তাকে মানুষ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।

চঞ্চল লিখেছেন- ভ্রাতা ও ভগ্নিগণ। আমি হিন্দু নাকি মুসলিম তাতে আপনাদের লাভ বা ক্ষতি কী? সকলেরই সবচেয়ে বড় পরিচয় ‘মানুষ’। ধর্ম নিয়ে এসকল রুচিহীন প্রশ্ন ও বিব্রতকর আলোচনা সকল ক্ষেত্রে বন্ধ হোক। আসুন, সবাই মানুষ হই।

চঞ্চল চৌধুরীকে উগ্র ধর্মীয় মন্তব্যে আঘাত করায় অভিনয়শিল্পীদের অনেকেই সেই ছবিটি নিজেদের ফেসবুকে শেয়ার করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

জনপ্রিয় অভিনেত্রী মোজেজা আফরোজ মোনালিসা ছবি পোস্ট করে প্রতিবাদ করে লিখেছেন, আমার মা, চঞ্চল চৌধুরী আমার ভাই। হ্যাসট্যাগে লিখেছেন, স্টপ সাইবার বুলিং, মানুষ হই, হোক প্রতিবাদ।

একই সঙ্গে এই অভিনেত্রী আরও লিখেছেন, মায়ের বেলাতেও ধর্ম টানে যেই জন, কে বলে মানুষ তারে, জানোয়ার সেই জন…। মায়ের ধর্ম শুধুই মা, জননী, গর্ভধারিণী। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি…। আবার এই মানুষই সবচেয়ে বড় হিপোক্রেট।

অভিনেতা আদনান ফারুক হিল্লোল প্রতিবাদ করে লিখেন, দেশ এবং প্রশাসন শিল্পীদের প্রোপার সম্মান তো কখনো করেইনি (শুধু সেলফি তোলা ছাড়া)। তাহলে জাতি শিখবে কোথা থেকে। কোনো শিল্পী যখন চরম দুরারোগ্য ব্যাধিতে পড়েন তখন প্রধানমন্ত্রী ২০-৫০ লাখ টাকার একটা চেক হস্তান্তর করেন, যা মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করে, দিন শেষে শিল্পীর টাইটেল হয় দুস্থশিল্পী।

সাইবার বুলিং? পুলিশের অনেক বড় কর্তাকে এ নিয়ে বহুবার বলেছি, উনারা বলেন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেন। আরে ভাই দেশে কোটি কোটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, আমিই যদি আসামির খবর দেব তো আপনার কাজটা কী? ধরে এনে ২টা বেতের বাড়ি দেয়া? এই দেশে আর খুব বেশিদিন শিল্পী থাকবে না, ধীরে ধীরে সবাই দেশ ছাড়বে, এই আজকে লিখে দিলাম, মনে রাইখেন। কেবলই গাধার পাল নিয়ে চলতে হবে একদিন। চঞ্চল চৌধুরী দোস্ত আমি মোটেই বিচলিত বা মর্মাহত নই, এত হবারই ছিল। সামনে আরো হবে।

নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী লিখেছেন, সমস্যাটা কোথায়? কী সমস্যা ভাই? মাথা মনে হয় মানসিকভাবে খারাপ। নাকি শিক্ষাদীক্ষার অভাব? চঞ্চল চৌধুরী আমার ভাই, আমাদের ভাই। আর মায়ের পবিত্র হাসির এই ছবিটা আমার এবং আমাদের অনেক প্রিয়। আমিও তো এই মায়ের মতোই এমন গেটআপ নেই। যা অনেক ভালোবাসার, অনেক শ্রদ্ধার। তো? আপনাদের রুচি নিয়ে আজ প্রশ্ন এই জাতির কাছে। অনেক হয়েছে। এইবার কিছু হোক। হ্যাসট্যাগে লিখেছেন, স্টপ সাইবার বুলিং, হোক প্রতিবাদ।

শুধু চঞ্চল চৌধুরী নয়, অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনার মাকে নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন একদল নেটিজেনরা। মা দিবসে নিজের ফেসবুকে মা ও বোনের সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করেন অভিনেত্রী আশনা হাবিব ভাবনা। পাশাপাশি মায়ের সঙ্গে কেক কাটার একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। সেই ভিডিও’র নিচে একের পর এক বাজে মন্তব্য করতে থাকেন নেটিজনরা। ভাবনা আর তার মাকে নিয়ে অনেকে উগ্র ধর্মীয় মন্তব্যও করেন।

তার এবং চঞ্চল চৌধুরীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভাবনা। এই অভিনেত্রী লিখেছেন, কালকে মা দিবস ছিল, তাই মাকে নিয়ে আমরা দুই বোন ছবি পোস্ট করেছি। তারপর যা হলো, আমার মাকেও এরা ছাড়ল না। মানুষ কারও মাকে নিয়ে এমন নোংরামি করতে পারে? সবাই এখন বলবেন এসব পাত্তা দিও না। আমি এক মুহূর্তের জন্যও এসব পাত্তা দেই না। কারণ আমাকে প্রতিদিন গালি খেতে হয় আমি জানি। এই ফেসবুক কিছু জঘন্য মানসিকতার মানুষের আস্তানা হয়ে যাচ্ছে। আর আমরা চুপ আছি। সাইবার ক্রাইম কেন দু-একটাকে শাস্তি দেয় না, আমি বুঝি না!

আরেক পোস্টে ভাবনা লিখেছেন, আমার হাতাকাটা ব্লাউজ নিয়ে তাদের কথা। আমার মা কেন টিপ পরল, আমার মা হিন্দু, আমার মা হিন্দু হোক আর মুসলিম হোক, তবে সে মানুষ। আমার মার ওড়না দেখা যাচ্ছে না কেন? এরাই ধর্ষক। এরা অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর মাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেন। তবে একটা জিনিস আজকে পরিষ্কার হলাম। আমাকে নিয়ে আমার কলিগরা কোনো দিন কোনো প্রতিবাদ করেননি। আমাকে প্রতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন হেয় করা হয় তারা চুপ থেকেছেন। আজকে ভালো লাগছে যে, চঞ্চল ভাইয়ের জন্য হলেও তারা প্রতিবাদ করছেন। কারণ প্রতিবাদ করা জরুরি। শিল্পীরা ইগনোর করে না, বয়কট করে না, তারা প্রতিবাদ করতে জানে। আমাদের মাদেরকেও যারা বাজে বলতে ছাড়ে না তাদেরকে শাস্তি দেয়া হোক। সাইবার ক্রাইম প্লিজ।

এসব ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক অভিনেতা আহসান হাবিব নাসিম লিখেছেন, চঞ্চল চৌধুরী এবং আশনা হাবীব ভাবনার মা দিবসের ফেসবুক পোস্টে যেসব মূর্খ মৌলবাদীরা কুরুচিপূর্ণ অশালীন মন্তব্য করেছে তার তীব্র প্রতিবাদ জানাই । চঞ্চল চৌধুরী, ভাবনা আমার ভাই বোন, তাদের মা আমারও মা । এসব সাইবার অপরাধীর বিচার চাই।

অভিনেত্রী শামীমা তুষ্টি লিখেছেন, চঞ্চল চৌধুরী আমার ভাই। সাইবার বুলিং হবার পর বহুবার বলতে হয়, তারপর শুনতে হয় একটু তো সহ্য করতে হবে,
সেটা আসলে কতটুকু সহ্য করতে হবে জানি না। সাইবার টিম, হ্যাসট্যাগে- হোক প্রতিবাদ, স্টপ সাইবার বুলিং।

অভিনেতা সাজু খাদেম লিখেন, চঞ্চল সাজু আত্মার বন্ধু… প্রাণের বন্ধু…। একই বাতাস, একই আকাশ, একই মাটি, একই পানি, একই ক্যাম্পাস, একই দেশ, একই পৃথিবী, একই স্বপ্ন, একই চিন্তা-চেতনায় মাখামাখি করে বেড়ে ওঠা। এখানে চৌধুরী আর খাদেম এর কোনো বেইল নাই। যারা এটাকে বেইল দেন তারা দূরে অন্ধকার গুহায় গিয়ে রূপকথায় বিভোর হয়ে থাকেন আলোতে আসার দরকার নাই। হ্যাসট্যাগে- হোক প্রতিবাদ।

নির্মাতা সিহাব শাহীন লিখেছেন, কোনো সমস্যা? চঞ্চল চৌধুরী আমার ভাই। তোমার মা আমার মা। হ্যাসট্যাগে- হোক প্রতিবাদ, স্টপ সাইবার বুলিং।

অভিনেত্রী শাহনাজ খুশি লিখেছেন, ধর্ম/জন্ম/কর্ম মানুষের জন্মগত অধিকার। কিছু মেধাহীন/গুণহীন কুলাঙ্গার এ সত্য নয় শুধু, সংস্কৃতির সৌন্দর্য এবং প্রফেশনের দায়িত্ব নিয়েও কুৎসিত মন্তব্য করে, তাদের কদর্য মানসিকতাই প্রকাশ করে।

যেকোনো সুযোগ পেলেই, শুধু নেটের শক্তির সুযোগ ব্যবহার করে, অসংখ্য সম্মানী/মানুষকে, (নারী হলে তো আরও উল্লম্ফন বাড়তে থাকে), বাজে মন্তব্যে অপদস্থ করতে থাকে। তার উদাহরণ মিতা হক আপা/কবরী আপা/এমপি মমতাজ বেগমকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো পোস্টে কুৎসিত কমেন্টসে ভরা! শাকিব খানকে নিয়ে দেয়া পোস্টেও অসভ্যতা বন্ধ হয়নি!! যাদের কানাকড়ি যোগ্যতা নাই, কিন্তু ৪৫-৭০ টাকার নেটের মাধ্যমে সফল/যোগ্য/সম্মানী মানুষটিকে বিষোদগার করছে!

তবে এটাই বাংলাদেশ নয় বন্ধু। আমাদের ভালোবাসা/বিশ্বাসে আর সুকর্মে আমরা শুদ্ধ নিঃশ্বাস নেব। আমরা আছি, থাকব, এ কদর্য অন্ধকার ভেদ করা আলো জ্বেলে। তবে অবশ্যই আইনের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সুষ্ঠু প্রয়োগ আশা করছি! মায়ের জন্য ভালোবাসা, শ্রদ্ধা।