আইনি ব্যাখ্যায় ‘যুবতি রাধে’ বিতর্কের অবসান ঘটালো ‘অ্যাডভোকেট লাউঞ্জ’

0
50

লিগ্যাল ভয়েজ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হচ্ছে আইন বিষয়ক জনসচেতনামূলক অনুষ্ঠান ‘অ্যাডভোকেট লাউঞ্জ’ । তারাই ধারাবাহিকতায় শনিবার রাত ৮টায়  সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত কপিরাইট ইস্যুতে ‘কপিরাইট আইনের তত্ব, স্বত্ব ও প্রয়োগ’ নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো ‘অ্যাডভোকেট লাউঞ্জ’ এর নতুন পর্ব । 

লিগ্যাল ভয়েস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজার সঞ্চালনায় এতে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ব্যারিস্টার আহমেদ এহসানুল কবির, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইন গবেষক অ্যাডভোকেট সাকলান ইমন এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম সম্রাট।

মানুষের সৃজনশীলতার মেধাস্বত্ব রক্ষায় কপিরাইটের গুরুত্ব অপরিসীম। সম্পদের যেমন নিবন্ধন করতে হয় তেমনি মানুষের মেধারও মালিকানা স্বত্ব গ্রহণ করা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশে বর্তমানে কপিরাইটের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে-এমন তথ্য জানিয়ে একে স্বাগত জানান উপস্থিত আইন বিশেষজ্ঞগণ।  তারা জানান, কপিরাইট ক্লেইম করার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিল্পকর্মের কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করে রাখা। অনিবন্ধিত মানে কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করা না থাকলে কপিরাইট ক্লেম করার সুযোগ নেই।

কপিরাইটের ধরণ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সালেহ আকরাম সম্রাট বলেন, “যেকোন সৃজনশীল কাজের কপিরাইটের ক্ষেত্রে ৫ ধরণের লেয়ার থাকতে পারে। যেখানে প্রতিটি রাইট আলাদা আলাদা ভাবে দাবি করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যদি সঙ্গীতের কথা বলি তবে- গানের লেখক বা গীতিকার, সুরকার, কম্পোজার এবং একজন কণ্ঠশিল্পী থাকতে পারেন। এসব কিছুর স্রষ্টা যদি একজন হয়ে থাকেন তবে এককভাবে কপিরাইট ক্লেম করা যায়, কিংবা ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি ওই গানের রচয়িতা, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, কম্পোজার হলে আলাদা আলাদা করে কপিরাইট ক্লেম করা যায়।”

কপিরাইটের ব্যতিক্রম বিধানাবলি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ব্যারিস্টার আহমেদ এহসানুল কবির বলেন, “শিক্ষণীয় ক্ষেত্রে বা পাঠদানে, বক্তৃতায় উদ্ধৃতি হিসেবে কিংবা অর্থনৈতিক অলাভজনক কাজে ব্যবহার করলে ফেয়ার ইউজ বলা হয়ে থাকে। তবে বানিজ্যিকভাবে একজনের সৃষ্টি অন্যজন ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আইনগত বাধ্যবধকতা রয়েছে যদি উক্ত সৃষ্টিকর্মের কপিরাইট নিবন্ধন করা হয়ে থাকে। ”

কপিরাইটের মেয়াদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এহসানুল কবির বলেন, “আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে, সৃষ্টিকর্মের স্রষ্টা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন কপিরাইটের সুফল ভোগ করতে পারবেন। আর উনার মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত তার উত্তরাধিকারীরা কপিরাইটের সুফল পাবেন। এরপর আর কপিরাইট থাকে না। সেই সৃষ্টিকর্ম তখন পাবলিক বা উমুক্ত হয়ে যায় সবার জন্য।”

জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোন সৃষ্টিকর্ম থেকে প্রভাবিত হয়ে কিছু লিখলে সেক্ষেত্রে কপিরাইট চাওয়ার সুযোগ আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার আহমেদ বলেন, “যদি ‘নভেলটি টেস্ট’ বা অভিনবত্বের পরীক্ষায় তা উত্তির্ণ হয় তাহলে সমস্যা নেই।  নভেলটি টেস্ট মানে পর্যাপ্ত নতুনত্ব যদি লেখায় থাকে তবেই পুরাতন সৃষ্টিকর্ম থেকে প্রভাবিত হয়ে নতুন তৈরি সৃষ্টিকর্মের কপিরাইট ক্লেম করা যেতে পারে। “

ভার্চুয়াল এ আলোচনায় দর্শকের এক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আলোচনায় উঠে আসে সম্প্রতি সরলপুর ব্যান্ডের ‘যুবতি রাধে’ গানটির মৌলিকত্ব ও তাদের কপিরাইট প্রসঙ্গে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইন গবেষক অ্যাডভোকেট সাকলান ইমন বলেন, “ইদানীং সময়ে সরলপুর ব্যান্ডের একটি গান “যুবতি রাধে” নিয়ে আইপিডিসি একটি প্রযোজনা করেছেন। গানটি নিয়ে সায়মন জাকারিয়া নামে একজনের কিছু কথা আমি শুনেছি।  আইনের একজন পাঠক হিসেবে আমার যেটা মনে হয়েছে, সরলপুর ব্যান্ডের গানটি যদি বিভিন্ন গীতিকা থেকে নিয়ে যদি লেখা হয়েও থাকে, আমার সাধারণ পাঠ থেকে আমি যেটা বুঝতে পেরেছি তাহলো এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি গান। রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলায় নিয়ে সরলপুরের গানটি সম্পূর্ণ তাদের মতো হয়েছে। এইক্ষেত্রে আইপিডিসি কিভাবে তা প্রচার করেছে, অনুমতি নিয়েছিল কি না সকল বিষয়সমূহ দেখা প্রয়োজন। আপনি যদি এখন বলেন, এরকম করা যাবে না, তাহলে কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে চর্চা তার পথ সংকুচিত হয়ে যাবে।  আমেরিকায় দেখা যাচ্ছে যদি কেউ নোভেলটি প্রমাণ করতে পারে সেক্ষেত্রে উক্ত গানের অন্য অংশগুলি যদি অন্য গানের সাথে মিল থেকেও থাকে তারপরও তা কপিরাইট পেয়ে যায়। ”

তিনি আরও বলেন, “এ গানটি যেহেতু বাংলাদেশে কপিরাইট করা আছে, এটি যদি কেউ ব্যবহার করতে চায়,তাহলে তাকে কপিরাইট শর্ত মেনেই ব্যবহার করতে হবে। তার মানে সরলপুর ব্যান্ডের অনুমতি নিয়েই গানটি ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে যদি তাদের অনুমতি না নেয়া হয়ে থাকে, তাহলে আইনের ব্যাত্যয় ঘটবে, সরলপুর ব্যান্ড এক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের দাবি রাখতে পারে, ভায়োলেশন যদি কন্টিনিউ করতে থাকে তাহলে তাহলে সরলপুর আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে। এটি খুবই ভালো যে, এ ধরণের একটি ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে গেছে, এখন যদি কেউ ভাবে আমি একটা গান লিখছি, আমি কিভাবে লিখবো, তখন কিন্তু সৃষ্টিশীলতা আরো বেড়ে যাবে। ”

আইন বিষয়ে মানুষের মাঝে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ‘অ্যাডভোকেট লাউঞ্জ’ নিয়মিত কাজ করে যাবে বলে জানান ব্যারিস্টার গাজী ফরহাদ রেজা। আয়োজনটির মিডিয়া পার্টনার ছিলো অনলাইন নিউজ পোর্টাল বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম, আদালত টিভি ও ল ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here