মুভি রিভিউ- ‘সঞ্জু’

0
123

পরিচালক- রাজকুমার হিরানী
অভিনয়- রণবীর কপূর, ভিকি কৌশল, অনুষ্কা শর্মা, দিয়া মির্জ়া
দেশ- ভারত
ভাষা- হিন্দি

একজন অভিনেতার জীবন। সেটি বর্ণময়। তার জীবনে মাদকাসক্তি আছে, টাডা আইন আছে, জেল আছে, একাধিক নারীসঙ্গ আছে, অন্ধকারে তলিয়ে গিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো ফিরে আসা আছে… সেই জন্যই বোধ হয় সঞ্জয় দত্তকে নিয়ে সাধারণ মানুষের এত আবেগ।

আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সংযোগের ফলে ‘খলনায়ক’ থেকে ‘নায়ক’ হয়ে ওঠা মানুষটির জীবনে ঘটনার কমতি নেই। ফলে তার জীবন নিয়ে যখন রাজকুমার হিরানীর মতো পরিচালক সিনেমা করছেন বলে ঘোষণা হয়েছিল, তখন রাজযোটক ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। উপরি পাওনা হিসেবে ছিলেন রণবীর কাপুর।

চলনে-বলনে-দেখায়-সংলাপে তাকে ‘সঞ্জয়’ বলেই মনে হয়েছিল। ফলে সিনেমা হলে ঢোকার সময় ট্রেলারের ভাষায় ‘সিটবেল্ট বেঁধে’ বসার মতোই অবস্থা ছিল। কিন্তু ‘সঞ্জু’ দেখা শেষ হওয়ার পর মনে হলো, খানিকটা উত্থান-পতন থাকলে মন্দ হতো না। আসলে ‘সঞ্জু’র মূল সমস্যাটি হলেন রাজকুমার হিরানী। হ্যাঁ, অবাক হবেন না। যিনি ‘মুন্নাভাই’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘পিকে’র মতো ছবি দিয়েছেন, তিনি এই ছবির সমস্যা।
আসলে রাজুর ছবিতে যে সিগনেচারটি থাকে, দর্শক তার প্রতিটি চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবেন, কাঁদবেন, হাসবেন… সেটি ‘সঞ্জু’তে নিরুদ্দেশ। ফলে ‘সঞ্জু’ মাদকাসক্ত হলে, পিতার সঙ্গে জাহাজের ডকে গান গাইলে, জেলে গেলে, এমনকী, পিতার চিতায় আগুন দিলেও, আপনি একাত্ম হবেন না। মনে হবে না গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আটকে রয়েছে। তাছাড়া, যে মানুষটির জীবন এত বর্ণময়, তার জীবনের আসল জিনিসগুলোই তো মিস করেছেন রাজু!

ছবির শুরুর দিকে ‘সঞ্জু’ বলে প্রায় ৩৫০ জন মতো নারীর শয্যাসঙ্গী হয়েছে সে। প্রেমও এসেছে প্রচুর। অথচ একমাত্র ‘রুবি’ (সোনম) এবং ‘মান্যতা’ (দিয়া) ছাড়া সঞ্জুর আর কোনও প্রেমই দেখাননি পরিচালক। মাধুরী দীক্ষিতের কথা বাদ দিন। সেটা না হয় বিতর্কিত। কিন্তু সঞ্জয়ের প্রথম দুই স্ত্রী রিচা এবং রিয়া… কারও অস্তিত্বই দেখাবেন না পরিচালক?

এমনকী, বাবরি মসজিদ ধ্বংস, বম্বে ব্লাস্টের সঙ্গে সঞ্জুর এ কে ৫৬ সঙ্গে রাখার সম্পর্কটিকেও বেশ সরল করেই দেখানো হয়েছে! আর গোটা ছবিটি আটকে গিয়েছে, দুই বন্ধুর (সঞ্জু ও কমলি) মিলন এবং ‘আমি টেররিস্ট নই’-এর জাঁতাকলে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। সঞ্জয় দত্তের ইমেজকে অহেতুক গৌরবান্বিত করার একটা চেষ্টা হয়েছে ‘সঞ্জু’ জুড়ে।

প্রথমদিকে সঞ্জুর মাদকাসক্ত হওয়া বা ‘রকি’র সময়টার ঘটনায় যতটা সময় দিয়েছেন পরিচালক, পরে সঞ্জুর জীবনের বাকি ঘটনাগুলোর দিকে সেভাবে দেননি। ফলে জেলের ভিতরে সঞ্জুর অসহায়ত্ব, অন্ধকার জগতের সঙ্গে সংযোগ… সব উপর-উপর হয়েই থেকে গিয়েছে।

কিন্তু ওই যে, লেখার শুরুতেই বললাম, রাজযোটক হয়েছিল। সঞ্জয়ের জীবন, রণবীর কাপুরের মতো অভিনেতা… অনেকগুলি রসদ নিয়ে বেশ এগিয়ে শুরু করেছিলেন রাজু। রণবীর এই ছবিতে চমৎকৃত করেছেন। দেখার দিক থেকে তিনি কতটা ‘সঞ্জয়’ হয়ে উঠেছেন, সেটা তো আগেই বলেছি, অভিনয়েও তাক লাগিয়েছেন। তিনি যে জাত অভিনেতা, সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই! কিছু-কিছু জায়গায় তার অভিনয় রীতিমত গায়ে কাঁটা লাগিয়েছে। তার যন্ত্রণা, স্টারডম, নেশাতুর অবস্থা, বাবার প্রতি অব্যক্ত ভালোবাসা… আস্ত ‘সঞ্জয়’কেই যেন নিজের শরীরে ধারণ করেছিলেন রণবীর। অবশ্য সঞ্জয়ের চরিত্রে তার অভিনয় কতটা মিমিক্রি, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সাধারণভাবে দেখলে রণবীর অসাধারণ। যোগ্য সহায়তা করেছেন ভিকি কৌশলও। ‘কমলি’ চরিত্রে রণবীরের সঙ্গে ভিকি যেভাবে পাল্লা দিয়েছেন, তাতে মুখ থেকে আপনা আপনিই ‘বাহ্’ বেরোবে।

সুনীল দত্তের চরিত্রে ভালো লেগেছে পরেশ রাওয়লকেও। তবে আনুশষ্কা, দিয়া, সোনমরা চিত্রনাট্যের চাহিদা মিটিয়েছেন মাত্র। এমনিতে ছবির চিত্রনাট্য, সঙ্গীত বা সম্পাদনা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। তবে রাজু বেশ কিছু মুহূর্ত তৈরি করেছেন এই ছবিতে। কমলির সঙ্গে সঞ্জুর বন্ধুত্বের বেশ কিছু জায়গা… বাবাকে লেখা চিঠি পড়ার দৃশ্যটা… রাজুর পুরনো স্টাইলের ঝলক দিয়েছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে রাজুর ছবিটিকে খুব সাধারণ বলিউ়ডি ছবি হিসেবে তৈরি করেছেন। ‘মুন্নাভাই এম বি বি এস’-এর ফুটেজ ব্যবহার করে হাততালি কুড়োনো তারই প্রমাণ। ফলে ‘সঞ্জু’ রক্তমাংসের সঞ্জয় হয়ে কখনওই ধরা দেয়নি। একজন ভাল মানুষ পরিস্থিতির শিকার… এটা শেষ পর্যন্ত দর্শকের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে জারিতও করতে পারেননি পরিচালক। আর এখানেই, ক্যারিয়ারে প্রথমবার হোঁচট খেয়েছেন রাজকুমার হিরানী।

সিনেমা রিভিউ- ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে নেয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here